:

আমদানির সূচি ওলোটপালট: বিকল্প উৎসের খোঁজে বিপিসি

top-news

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি তেল সরবরাহ নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে বাংলাদেশ। ওদিকে সরবরাহ সংকটের আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে হুলুস্থুল পড়ে গেছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেল নিতে ভিড় করছেন গ্রাহকরা, কোথাও কোথাও সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘ লাইন। তবে সরকার বলছে, এখনো বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়নি এবং বিকল্প উৎস থেকে তেল সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।

বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) তথ্যমতে, সোমবার পর্যন্ত দেশে প্রধান জ্বালানি **ডিজেলের মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন**, যা দিয়ে মাত্র ১৪ দিন চাহিদা মেটানো সম্ভব। অন্যান্য জ্বালানির অবস্থা : অকটেন:মজুত ১১ হাজার টন (৯ দিনের চাহিদা)। পেট্রোল: মজুত ১৬ হাজার ৬০৫ টন (১১ দিনের চাহিদা)। ফার্নেস অয়েল: ২৯ দিনের মজুত। জেট ফুয়েল:২৩ দিনের মজুত।

ইস্টার্ন রিফাইনারিতে থাকা ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল দিয়ে আরও ১৭-১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। কিন্তু নতুন চালান সময়মতো না এলে এই উৎপাদনও বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরান ও ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনার পর মধ্যপ্রাচ্যের প্রধান নৌপথ হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। এর ফলে জাহাজ সূচিতে বিপর্যয়:  চলতি মাসে ১৭টি জাহাজ আসার কথা থাকলেও এসেছে মাত্র ৮টি। ৬টি জাহাজের বিষয়ে এখনো কোনো নিশ্চয়তা মেলেনি। চুক্তি বাতিল: সৌদি আরব ও আবুধাবি থেকে তেল আসার কথা থাকলেও জাহাজ জটিলতায় সেই চালানগুলো আটকে গেছে। মূল্যবৃদ্ধি: আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ায় আমদানি ব্যয় বাড়ছে। বিকল্প উৎস হিসেবে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে তেল আনার নিশ্চয়তা মিললেও সেখানে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করতে হচ্ছে।

সংকট আরও বাড়তে পারে—এমন আতঙ্কে অনেক গ্রাহক প্রয়োজনের অতিরিক্ত তেল কিনে রাখছেন। পেট্রল পাম্প মালিকরা বলছেন, চাহিদা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় অনেক পাম্পে তেল ফুরিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও প্রাইভেট কার চালকদের ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।

 সরকারের আশ্বাস ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম জানিয়েছেন, এপ্রিলের আমদানিসূচি চূড়ান্ত করা হচ্ছে এবং প্রয়োজনে খোলাবাজার থেকে পরিশোধিত ডিজেল কেনা হবে। তিনি আতঙ্কিত হয়ে অতিরিক্ত তেল না কেনার জন্য দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছেন।

তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ম তামিম মনে করেন, পরিস্থিতি সামাল দিতে মাঠপর্যায়ে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। তিনি বলেন, "অতিরিক্ত মজুত বা কৃত্রিম সংকট তৈরির প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে সীমিত পরিসরে রেশনিং ব্যবস্থা চালুর চিন্তা করা যেতে পারে।"

বিপিসি আশা করছে, ভারত থেকে পাইপলাইনে আসা তেল এবং এপ্রিল মাসে পরিকল্পিত আমদানির মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হবে। তবে সবকিছুই নির্ভর করছে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহকারীদের সিদ্ধান্তের ওপর।

রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)-এর সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা মেটানোর মতো। তবে অন্য জ্বালানিগুলোর ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ভিন্ন।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর একটি অংশ অপরিশোধিত তেল, যা মূলত সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে আসে। মোট চাহিদার একটি অংশ দেশে পরিশোধন করা হয় এবং বাকিটা পরিশোধিত অবস্থায় আমদানি করা হয়।

দেশে জ্বালানির সবচেয়ে বড় অংশই ডিজেলনির্ভর। কৃষি সেচ, পরিবহন এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলের ব্যাপক ব্যবহার রয়েছে। ফলে ডিজেলের সরবরাহে চাপ তৈরি হলে তার প্রভাব দ্রুত অন্যান্য খাতেও ছড়িয়ে পড়ে।

বর্তমানে দেশে ডিজেলের সংরক্ষণ সক্ষমতা প্রায় ৬ লাখ ২৪ হাজার টন। এর মধ্যে সরবরাহযোগ্য মজুত রয়েছে প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ এবং প্রায় দুই সপ্তাহের চাহিদা মেটাতে সক্ষম।

দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে।

আর ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুত ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।

এদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারি-তে বর্তমানে প্রায় ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত রয়েছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন পরিশোধন ক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ডিজেল সংরক্ষণের মোট সক্ষমতা ৬ লাখ ২৪ হাজার ১৮৯ টন। গতকাল পর্যন্ত সরবরাহযোগ্য মজুত ছিল ১ লাখ ৮৫ হাজার টন, যা মোট সক্ষমতার প্রায় ২৯ শতাংশ। এই মজুত দিয়ে প্রায় ১৪ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব।

১ মার্চ থেকে গত রোববার পর্যন্ত দেশে ডিজেল বিক্রি হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৬৪ হাজার টন। সে হিসাবে দৈনিক গড় বিক্রি প্রায় ১২ হাজার টন। গত বছরের একই সময়ে তা ছিল সাড়ে ১২ হাজার টনের কাছাকাছি।

দেশে অকটেনের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৫৩ হাজার ৬১৬ টন। বর্তমানে মজুত আছে প্রায় ১১ হাজার টন, যা দিয়ে প্রায় ৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। পেট্রলের মোট সংরক্ষণ সক্ষমতা ৩৭ হাজার ১৩ টন। এর মধ্যে মজুত রয়েছে ১৬ হাজার ৬০৫ টন, যা দিয়ে প্রায় ১১ দিন সরবরাহ বজায় রাখা যাবে।

আর ফার্নেস তেলের মজুত রয়েছে ৭০ হাজার ৮৩৩ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ সম্ভব। আর জেট ফুয়েলের মজুত ৩৪ হাজার ৮৭৭ টন, যা দিয়ে প্রায় ২৩ দিন সরবরাহ চালানো যাবে। কেরোসিনের মজুত ৮ হাজার ৫৭১ টন, যা দিয়ে ৪৬ দিন চাহিদা মেটানো যাবে। মেরিন ফুয়েলের মজুত আছে প্রায় দেড় হাজার টন, যা দিয়ে ৪৪ দিন সরবরাহ সম্ভব।

অন্যদিকে ইস্টার্ন রিফাইনারিতে বর্তমানে ৮০ হাজার টন অপরিশোধিত তেল মজুত আছে। দৈনিক গড়ে সাড়ে ৪ হাজার টন শোধনক্ষমতা বিবেচনায় এই মজুত দিয়ে আরও ১৭ থেকে ১৮ দিন উৎপাদন চালানো সম্ভব। তবে নতুন চালান সময়মতো না এলে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। 

বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, চলতি মাসে ডিজেল ও ফার্নেস অয়েল নিয়ে মোট ১৭টি জাহাজ আসার কথা ছিল। কিন্তু যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে গতকাল পর্যন্ত দেশে পৌঁছেছে ৮টি জাহাজ, যেগুলো থেকে প্রায় ২ লাখ টন তেল পাওয়া গেছে।

আরও দুটি জাহাজ আসার কথা থাকলেও বাকি ৬টি জাহাজের বিষয়ে এখনো নিশ্চিত হতে পারেনি বিপিসি। ফলে প্রায় দেড় লাখ টন জ্বালানি তেল পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

বিপিসির নথি অনুযায়ী, বড় দুই সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান (চীনের ইউনিপেক ও মালয়েশিয়ার পেটকো ট্রেডিং) ইতিমধ্যে জানিয়েছে, যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে তারা নির্ধারিত সময় মেনে তেল সরবরাহ করতে পারছে না। তবে এই ঘাটতি কিছুটা পুষিয়ে নিতে ভারত থেকে পাইপলাইনে ১০ হাজার টন তেল এসেছে, আর এ মাসে আরও ৫ হাজার টন আসতে পারে।

৩ মার্চ সৌদি আরবের রাস তানুরা টার্মিনাল থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার কথা থাকলেও জাহাজটি আটকে যায়। আবার আবুধাবি ন্যাশনাল অয়েল কোম্পানি (অ্যাডনক) থেকে তেল আনার জন্য ভাড়া করা ‘এমটি ওমেরা গ্যালাক্সি’ নামের জাহাজটির চুক্তিও বাতিল হয়েছে। ফলে চলতি মাসে নতুন কোনো অপরিশোধিত তেলের চালান দেশে আসছে না।

অবশ্য বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে আগামী মাসে সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে ১ লাখ টন অপরিশোধিত তেল আনার নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে প্রতি ব্যারেলে অতিরিক্ত ২৫ সেন্ট বেশি খরচ করতে হবে সরকারকে।

বিপিসি এপ্রিল ও মে মাসের পরিকল্পনা
পরিস্থিতি সামাল দিতে এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রাথমিক আমদানি সূচি তৈরি করেছে বিপিসি। এপ্রিলে সমুদ্রপথে ১৪টি জাহাজ এবং পাইপলাইনে ৩টি পার্সেলের মাধ্যমে মোট ৩ লাখ টন ডিজেল, ৫০ হাজার টন জেট ফুয়েল, ২৫ হাজার টন অকটেন এবং ৫০ হাজার টন ফার্নেস তেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টন ডিজেল এবং পাইপলাইনে ২০ হাজার টন সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। মে মাসে ১৭টি জাহাজে সাড়ে ৩ লাখ টন ডিজেলসহ অন্যান্য জ্বালানি আসার সূচি ঠিক করা হয়েছে। তবে সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো চূড়ান্ত মত দেয়নি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *